এক সময় যাদের ছিল, আজ তারা নদী ভাঙ্গনে নিঃস্ব দশমিনার উথলী জাতির কথা
প্রমত্তা তেঁতুলিয়া ও বুঁড়াগৌরাঙ্গ নদীর তীর ঘেঁষে ভাঙ্গণ প্রবন উপজেলা পটুয়াখালীর দশমিনা। প্রতি বছর নদীর ভাঙ্গনে বসতি হাড়ায় এই উপজেলার হাজার হাজার মানুষ। তাদেরই একজন হাজীর হাট লঞ্চঘাটের অদূরে কেদীর বাঁধ এলাকার আম্বিয়া বিবি (৫৫)। এক সময় ৰেত ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরম্ন ছিল। দুধে ভাতে খেয়ে পার করত জীবন। বার বার নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে আজ নিঃস্ব আম্বিয়া উথলী জাতির একজন। আম্বিয়ার স্বামী আশ্রব আলী মৃধা বড় কৃষক থেকে আজ জেলেতে পরিনত। আর্থিক অনাটনে ছেলে-পুলের লেখা পড়া করাতে পারেনি, দুই ছেলে, বড় ছেলে মজিদ (৩৫) অন্যের জালের নৌকায় কামলা দেয় আর ছোট ছেলে ছালাম (৩০) বাবার সাথে মাছ ধরে। একটি মাত্র মেয়ে ভাল ছেলে দেখে টাকা-কড়ি খরচ করে বিয়ে দেয়। সুখ বুঝি তার কপালে সয়না তাই রম্নজিনা (৭) এর জন্মের সময় চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। রম্নজিনা নানীর সংসারে এসে বড় হতে থাকে। রোজিনাকে দেখাশোনা করার জন্য বড় ছেলে মজিদকে বিয়ে দেয়। মজিদের স্ত্রী জামিলা এক কন্যা সনত্দানের জন্মদেয়। কোন রকম সুখেই কাঁটে জীবন তাই শখ করে মেয়ের নাম রাখে জান্নাতুল ফেরদৌস (১)। জান্নাতুললের জন্মের বছর সাপের দংশনে মারা পরে জামিলা। সব মিলিয়ে আম্বিয়া ৩ জঞ্জাল নিয়ে সংসার গড়ে নদীর পারে তালুকদারদের পতিত জমিতে। তাদের এলাকা নদীর মধ্যে জেগে ওঠা অসংখ্য চরের মধ্যে প্রধান চারটি চর চর বেড়ি বাঁধের পাশে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। এখানেই গড়ে উঠছে নদীর ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় নিঃস্ব মানুষের বসতি। যাদের একসময় ৰেত ভরা ধান, গেয়াল ভরা গরম্ন আর পুকুর ভরা মাছ নিয়ে সুখে ভরা ছিল জীবন, সেই সব মানুুষের জীবন ও জীবিকায় এখন শুধুই অবর্ণনীয় দুঃখ হতাশা। ছোট ঘরগুলো বাসের উপযোগী নয়। তারপরও এখানেই থাকতে হচ্ছে মানবেতর ভাবে। বছরের পর বছর আগ্রাসী নদীর ভাঙ্গনে বদল করতে হয়েছে ঠিকানা। সব হাড়িয়েছে আজ! ভাঙ্গন কবলিত মানুষ এখন শেষ আশ্রয়স্থল টুকু হাড়িয়ে আশ্্রয় নিয়েছে খাস জমি, বেঁড়ি বাঁধ কিংবা ভূস্বামীদের পতিত জমিতে। উপজেলায় গত প্রায় তিনদশকের নদী ভাঙ্গা মানুষগুলো আজ সকল নিঃস্বতা, দৈন্যতা আর কষ্টে ভরা জীবন ঘটনাবর্তের ইতিহাস হয়েছে। তাদের করম্নন আর্তনাদের নিচে চাপা পড়ে গেছে কালের সাফল্য অর্জনের অনেক কাহিনীচিত্র। এখন নদীর ভাঙ্গনে বিপর্যসত্দ হয়ে বেঁড়ি বাঁধের দু'পারে হয়েছে তাদের আশ্রায়স্থল। এসব বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সংগ্রামী মানুষের মেরম্নদন্ড ধনুকের মতো বাঁকা। জীবনযুদ্ধে ধুঁকে ধুঁকে ৰয়ে যাওয়া কন্ঠে এখন তারা বলে, "খাবার চাই! বস্ত্র চাই! বাসস্থান চাই! সর্বপরি বাঁচতে চাই! চাই! চাই! আর চাই এর আর্তনাদের আড়ালে মরতে চাওয়াদের সংখ্যাও কম নয়। উপজেলার প্রায় ৩শ ৫৪ দশমিক ৪৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে প্রায় দেড় লাখ লোক বসবাস করে। উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও পূর্ব-দৰিন দিক দিয়ে বহমান উত্তাল তেঁতুলিয়া-বুঁড়াগৌরাঙ্গ দু'নদী ভাঙ্গন প্রবন। নদীর জোয়ারে লবনাক্ত পানীর প্রবেশ আর বন্যার পস্নাবন ঠেকাতে নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে বাঁশবাড়িয়া, দশমিনা ও রণগোপালদী এ তিন ইউনিয়নে ১শ কিলোমিটার বেঁড়ি বাঁধ রয়েছে। বেঁড়ি বাঁধে, রৰা এলাকার বাহিরের বসতিরা ভাঙ্গনের শিকার হয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ বসবাস করে এই খাস ভূমীতে। বেঁড়ি বাঁধের পাড়ের বসতিদের ৯০ভাগ দারিদ্র সীমার নিচে। এখানকার কর্মজীবিদের প্রায় ১০শতকরা কৃষক, ৬৫ শতকরা জেলে ও ২৫ শতকরা মানুষ দিনমজুর। তারা সকলেই অতি অভাবী। এক সময়ের উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবৃত্ত পরিবার এখন জেলে দিনমজুরে পরিনত হয়েছে। এখানকার কৃষকরা নিজের স্বল্প জমিসহ অন্যের জমি চাষ করে, উৎপাদিত ফসলের মধ্যে ধান, ডাল, বাদাম ও সুপারি প্রধান অর্থকারী ফসল। জেলে সম্প্রদায় জাটকা নিধন, মা-মাছ নিধন ঠেকানোর অবরোধ সময়ে কষ্টে দিন কাঁটায়। অনেকেই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। দিন মজুরের ধান কাঁটা ও রাসত্দা মেরামতের কাজ উলেস্নখযোগ্য হলেও বছরের ৭মাস কোন কাজ থাকেনা। এসব বেঁড়ি বাঁধের পাশের মানুষগুলো কর্মবিরতি কালে জমানো অর্থকড়ি খাওয়া ছাড়াও সরকারি ও এনজিও থেকে ঋণ করে সংসার চালায়। অপরদিকে, এলাকার মহাজন শ্রেনীর থেকে উচ্চ সুদে দাদন নিয়ে জীবিকা রৰা করতে হয়। এছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগে দিনের পর দিন বসে থাকতে হয়। প্রতিদিন অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটায় এসব পরিবারের মানুষগুলো। এ কষ্টে বছরের পর বছর অতিক্রম করে আসছে উপূকলীয় দশমিনার এ জনপদের মানুষ। গত প্রায় তিন দশকে নদী ভাঙ্গনে ১২টি গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে। ভিটে মাটি হাড়িয়ে নিঃস্ব হয়েছে ৪ হাজার পরিবার। বিলীন হয়ে যাওয়া গ্রামগুলো হচ্ছে, ভোলাই শিং, বেল চর, ঘুনির চর, পাতারচর ,চঙ্গারচর, ঢনঢনিয়া, কাটাখালী, সৈয়দজাফর, আউলিয়াপুর চরতৈলাৰ্য, গোলখালী, হাজিকান্দা। ্এসব মানুষের নেই শিৰা স্বাস্থ্য সচেতনতা। উপজেলার রনগোপালদি ইউনিয়ানের আলিয়াপুর গ্রামে বুড়াঁগৌরাঙ্গ নদীর তীর ঘেঁষা, বেঁড়িবাধে আশ্রয় নেয়া প্রয়া ২শতাধিক পরিবার। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধশত লোক ভিৰা করে জীবিকা নির্বাহ করে। ভিৰা করে লাল মিয়া হাং (৫৫), কাসেম (৭০), জব্বার মৃধা (৬৫), জয়নাল খাঁ (৫০), লাল বিবি (৫৫), লালসি (৭০)। জমিজমা না থাকায় বৃদ্ধ বয়সে নদীতে জাল ফেলে জীবিকা নির্বাহ করে একই ইউনিয়ানের কুঠু হাওলাদার (১০৫), কাসেম দুয়ারী (৭০), আকুবালী জোমাদ্দার (৮০), জব্বার খাঁ (৮৫)। উপজেলার বাঁশবাড়ীয়া, ঢনঢনিয়া, হাজির হাট, গোলখালী, কাঁটাখালী, সৈয়াদ জাফর, ঘুনিরচর, দৰিন রনগোপালদির বেঁড়ি বাধের আশ্রিত নদীর ভাঙ্গা মানুষের একই অবস্থা।